দীর্ঘদিন ঠান্ডা তুষারে ভরা শীতের অন্ধকারের স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেখা পেতে শুরু করেছে সূর্যের আলো। ফুলের বাহার ভরা ফাগুনের এই আনন্দঘন সময় সুইডিশদের বেশ আপ্লুত করে, সঙ্গে আমাকেও। এপ্রিলের শেষের দিনে ট্র্যাডিশনাল ওয়েতে মাইব্রসারে (বনফায়ার) আগুন জ্বালিয়ে শীতের বিদায় দিতে হয়। মাইব্রসা হচ্ছে খড়কুটোসহ সব আবর্জনা ও জঙ্গলের পড়ে থাকা অকেজো গাছপালা একত্র করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া এবং এর চারপাশে সবাই সারিবদ্ধ হয়ে হাতে হাত রেখে নাচ-গান করা। মূলত শীতকে বিদায় এবং বসন্ত তথা গরমকে স্বাগত জানানোর এক অতি পুরোনো প্রথা, যা হয়ে আসছে সম্ভবত ১৩০০ সাল থেকে। তবে সুইডেনে মাইব্রসা বা ভলবোরি দিনটি সরকারিভাবে ১৯০১ সালে সুইডিশ পঞ্জিকাতে প্রবর্তিত হয়েছে এবং সেই থেকে দিনটিকে বসন্তের প্রতীক এবং শীত শেষের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সুইডেনের চারপাশে পৌরসভা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে বনফায়ারের আয়োজন করা হয়। বন্ধুবান্ধব ও পরিবার প্রতিবছরই বারবিকিউ, গেট টুগেদার বা পিকনিক করতে জড়ো হয় এ দিনটিতে।

গ্রীষ্মের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে রাতের শেষে এক নতুন সূর্যোদয়ে প্রতিবছরের মতো এবারও হাজির হয় পয়লা মে, ‘লেবার ডে’। দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য মানবজাতির কর্মজীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চিরপরিচিত ধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, রাইটস অ্যাগেইনস্ট ফাইট, পরাধীনতা থেকে স্বাধীন বা রাজনীতির কারণে যুগ যুগ ধরে সময়ে-অসময়ে ট্রাজেডি এবং অকালমৃত্যু ঘটেছে হাজারো নির্দোষ মানুষের। ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের স্বার্থে স্মৃতির জানালা খুলে দেখলে অনেক ঘটনার দেখা মেলে।

পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে ‘সানডে ব্লাডি সানডে’র মতো হাজারো দিনের কথা বেরিয়ে আসবে। যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি, আমাদের জাতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় রক্ত ঝরা দিন। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের এক রোববার উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ব্রিটিশদের সংঘর্ষে ঝরে পড়েছিল ১৪ জন আইরিশ নাগরিকের প্রাণ, কেবল ধর্মীয় ভিন্নমতের কারণে। সেই থেকে বিখ্যাত আয়ারল্যান্ডের রক গোষ্ঠী ইউ-টু ব্র্যান্ডের ‘সানডে ব্লাডি সানডে’ গানের উৎপত্তি। বিশ্বের এ রকম হাজারো স্মরণীয় দিনের মতো ‘লেবার ডে’ একটি বিশেষ দিন। পৃথিবীর সব দেশেই কম–বেশি দিনটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

১৮৮৬ সালের ৪ মে, শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ারে ঘটেছিল এক রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড। যা ছিল শিকাগোর সাধারণ কর্মচারীদের এক মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক হীন প্রয়াস। তাঁদের দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু হবে এবং ৮ ঘণ্টা পর শেষ হবে, যা পরে পুরো বিশ্বের কর্মচারীদের সমস্যার সমাধান ঘটিয়েছে। বলতে হয় ‘লোকাল কনসার্ন গ্লোবাল সলিউশনস’।

১ মে সুইডেন, নরওয়ে ও আইসল্যান্ডে ছুটির দিন, কিন্তু ডেনমার্কে দিনটি অফিশিয়াল ছুটির দিন নয়। দিনটিতে বেশ স্মৃতিচারণা করা হয়ে থাকে বিক্ষোভ মিছিলের সঙ্গে।
বহু বছর আগের কথা। কাজের ফাঁকে হন্যে হয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর সেদিন শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ারের দেখা পেয়েছিলাম। দূর পরবাসী বন্ধু দীর্ঘ এক যুগ ধরে শিকাগোতে বাস করছে। আমার সঙ্গে হে-মার্কেটে আসার পর বলেছিল, তার এ পথেই আসা-যাওয়া প্রায় প্রতিদিন। কিন্তু জানত না এটাই যে সেই বিখ্যাত জায়গা, যার কারণে দুনিয়াজুড়ে মে দিবস পালিত হয়।

গাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে এর আগে হাত নেড়ে মাথা ঘুরিয়ে আমাকে শিকাগোর অলিগলি দেখিয়েছিল বন্ধু। তবে একটি বড় বাতাস ভরা বেলুনের মতো হঠাৎ একটু লজ্জা পেয়ে যেন আলপিনের আচমকা টোকায় চুপসে গিয়েছিলাম সেদিন, যখন জানলাম, বেশির ভাগ আমেরিকানও জানে না মে দিবস কী? জিজ্ঞাসা করলে বেশির ভাগই বলবে, সেটা আবার কী? এখানে ১ মে একটি কাজের দিন। ছুটি নেই। এখানে পালন করা হয় ‘লেবার ডে’। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার, যা তাঁদের ছুটির দিন। সেদিন তাঁরা দলে দলে রাস্তায় নেমে লাল পতাকা নিয়ে গলা ফাটিয়ে মিছিল করে না ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।
এখানে লেবার ডে পালন করা হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্‌যাপন হিসেবে। তবে তাঁদের মে দিবস থেকে লেবার ডে-তে সরে আসার পেছনের কারণ ভিন্ন। সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদের সঙ্গে কমিউনিজমের দ্বন্দ্ব। পুরোটাই আসলে নীতি ও রাজনীতির ঘূর্ণিপাক। ভিন্ন ভিন্ন অক্ষকে কেন্দ্র করে শুধু নিজেদের চিন্তাভাবনার বিস্তার।

যে চিন্তাভাবনার ঘূর্ণিতে এখানে হে স্কয়ার কিংবা মে দিবস চাপা পড়ে গেছে। হয়তো কমিউনিজমের ডানাও এখন পুঁজিবাদের গ্রাসে। বাংলাদেশের লাল পতাকার নেতাদের এখন আর পিকিং–পন্থী বলা যায় না। সোভিয়েত–পন্থী হওয়ার সুযোগ তো নেই-ই। মার্কিনপন্থাকেই তাঁরা বেশ পছন্দনীয় মনে করছেন। সুইডেনের মতো বাংলাদেশের রাজপথও ঝাঁজাল বক্তব্য থেকে অব্যাহতি পেয়েছে নিশ্চয়ই? পপুলার এক বাম নেত্রীর সঙ্গে স্টকহোমের রাস্তায় কথা হলো। জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছি? বললাম, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্য দেখছি আর ঘুরছি। তিনি একটু ইতস্তত বোধ করলেন। হেসেও দিলেন। যা–ই হোক, লিখতে লিখতে হঠাৎ সুইডেনের বিশ্বজোড়া পপস্টার জারা লারসনের কথা মনে পড়ল।

প্যারিসের কাথেড্রাল নটর ডামের অগ্নিকাণ্ডের পর মেরামত করার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে গোটা বিশ্ব। এমন একটি সময় জারা গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, আফ্রিকার মানুষ না খেয়ে মরছে সেদিকে খেয়াল নেই, অথচ কোটি কোটি ডলার ডোনেশন নটর ডামের জন্য। পরের দিন সে ১৫০ হাজার ক্রোনারের শপিং করেছে পোশাক–আশাক কেনার পেছনে। কথায় বলে, ‘ওয়াক অ্যাজ ইউ টক।’ কিন্তু বাস্তব এখনো বহু দূরে। মে দিবসের বক্তৃতায় অনেক কথাই বলা হয়, অনেক কিছুই লেখা হয়।

আমার প্রশ্ন, করা হয় কি সেগুলো? হাজারো প্রশ্ন, জানি না এ প্রশ্নের উত্তর আছে কি না! জানি না পৌঁছাবে কি না তাদের কাছে আমার এ লেখা, যারা দিতে পারবে এর উত্তর।
বাংলার মেহনতি মানুষ কি দিনের শেষে তাঁর প্রাপ্য পান? পান কি তাঁর ন্যায্য মজুরি? বাসার সাহায্যকারী কি ঠিকমতো পেট ভরে খেতে পান দু’মুঠো ভাত? তাঁদের কি ঠিক ৮ ঘণ্টা খাটানো হয় প্রতিদিন? আছে কি তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের নিরাপত্তা?

১ মে, বিশ্ব লেবার ডে দিনটিকে সামনে রেখে ১৯০৭ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একটি ছোট্ট কাগজের ফুল হয়ে ওঠেছে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। সুইডেনে আমরা বলি মাইব্লোম্যান। সেই ১৯০৭ সাল থেকে সুইডেনে শিশুদের জন্য কাগজের তৈরি ফুলটি একটি পার্থক্য তৈরি করেছে। বেদা হালবার্গ (Beda Hallberg), যিনি মাইব্লোম্যান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি শিশু ও যুবকদের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দ্বারা চালিত ছিলেন এবং প্রত্যেককে একটি ভালো এবং শক্তিশালী সমাজে অবদান রাখার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেই থেকে প্রতিবছর এপ্রিলের শুরুতে ফুলটি নানাভাবে বিক্রি হয়ে থাকে সুইডেনসহ নর্ডিক দেশগুলোতে। এমনকি বিশ্বায়নের আরও অনেক দেশে এটা বিক্রি করা হয় এবং ১ মে–কে সামনে রেখে সংগৃহীত অর্থ শিশুদের আর্থিক সহায়তায় বিতরণ করা হয়। আমরা কি এমন একটি উদ্যোগ নিতে পারি না এবারের ১ মে শ্রমিক দিবসকে সামনে রেখে, যেমন কোনো শিশুই যেন রাস্তায় ভিক্ষা না করে, বরং সব শিশুই যেন সুইডেনের মতো সুযোগ–সুবিধা পেয়ে সুযোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *