• সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১

পরিযায়ী পাখি সিঁথি হাঁস

প্রিয় প্রতিবেদন: প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২০
শীত এসে গেছে। আসতে শুরু করেছে পরিযায়ী পাখিরা। হাকালুকি হাওরে তখন শীতের মৃদু আমেজ। দূরবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রেখে চলে পাখির অনুসন্ধান। নানা জাতের নানা রঙের পাখিতে এখন ভরপুর এখানকার পরিবেশ। ইতোমধ্যে এসে পড়েছে পরিযায়ী হাঁসের দল। সব হাঁসেদের মধ্যে একটি বিশেষ হাঁসটিকে চিনে নিতে তেমন একটা অসুবিধে হয়না। কারণ হাঁসটির মাথা রাঙানো রয়েছে হালকা ইটহলুদ রঙ দিয়ে। সেই হাঁসটির নাম ইউরেশীয় সিঁথি হাঁস বা লালশির। তবে বাগেরহাটের মানুষ একটি সুন্দর একটি নামে ডাকে, তা হলো লালমাথা হাঁস।
এদের ইংরেজি নাম Eurasian Wigeon এবং বৈজ্ঞানিক নাম Mareca penelope। এরা মাঝারি আকৃতির হাঁসদের মধ্যে বড় এবং মিঠাপানি জলাভূমির অস্থায়ী বাসিন্দার।
শীতের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য উত্তরের হিম প্রধান অঞ্চলগুলো থেকে অনেক প্রজাতির পাখিই পরিযায়ী হয়। পাখিদের মধ্যে সাধারণত তিন ধরণের পরিযান দেখা যায়। এগুলো হলো স্বল্পদৈর্ঘ্য পরিযান, মধ্য দৈর্ঘ্য পরিযান এবং দীর্ঘ দৈর্ঘ্য পরিযান। সিঁথি হাঁস দীর্ঘ দৈর্ঘ্য পরিযানের পাখি। এরা হাজার হাজার মাইল দূরত্বের পথ অনায়াসে উড়ে যেতে পারে। ক্লান্তিহীন ও বিশ্বস্ত পাখা তাদের এভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর ধরে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব সূত্র থেকে জানা যায়, শীতে বাংলাদেশে পরিযায়ী হিসেবে যে প্রায় ত্রিশ প্রজাতির হাঁস আসে। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় দেখা যায় এই ইউরেশীয় সিঁথি হাঁসকে। এরা আমাদের দেশের সুলভ পরিযায়ী হাঁস। এরা বেশ দৃষ্টিনন্দন। ছেলে হাঁস পাখির মাথায় হলুদ রঙের সিঁথি আছে বলেই এরূপ নামকরণের কারণ। মিশ্র হাঁসেরঝাক থেকে সহজেই আলাদা করা যায় এদের। শীতকালে বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের উপকূলসহ নদী ও হাওরে দেখা যায়।
সিঁথি হাঁসের দৈর্ঘ্য ৫০ সেমি এবং ওজন ৬৭০ গ্রাম। এরা ধূসর নীলচে ঠোঁটওয়ালা মাঝারি আকারের হাঁস। ছেলে ও মেয়ে হাঁসের চেহারায় পার্থক্য রয়েছে। প্রজননকালে ছেলে হাঁসের স্পষ্ট হলুদ কপাল। মাথা তামেটে। বগল ধূসর এবং লেজের তলা কালো। লালচে বাদামি মেয়ে হাঁসের বগল পিতাভ। পেট সাদা এবং খয়রি ডানা। এরা সাধারণত অগভীর জলাশয় যেমন- হ্রদ, নদী, হাওড়, বিলে বিচরণ করে। জলাশয়ের পাড়ে হেঁটে অথবা অগভীর জলে মাথা ডুবিয়ে খাবার খোঁজে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ভেজা ঘাস, জলজ উদ্ভিদ, পোকা-মাকড়, লার্ভা ইত্যাদি। ইউরোপ হয়ে আফ্রিকার উত্তরাংশ ও এশিয়া পর্যন্ত এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি। এশিয়া মহাদেশে পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, চীন ও ফিলিপাইনে পাওয়া যায়। ইউরেশীয় সিঁথি হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
প্রতিবছর শীতে একটুখানি খাদ্য ও আবাসের জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এরা আমাদের জলাশয়গুলোতে আসে। এসে বরং উপকারই করে আমাদের। এদের বিষ্ঠা জমির উর্বরতা বাড়ায়। পানিতে সাঁতার কাটার ফলে মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। পর্যটকদের দৃষ্টিনন্দন করে বলে পর্যটন শিল্পের প্রসার হচ্ছে। তবে সমাজের কিছু অসাধু, লোভী গুটিকয়েক লোকের কারণে এদের সংখ্যা দিন-দিন কমে যাচ্ছে। বিষ টোপ, এয়ারগান প্রভৃতি দিয়ে নির্মমভাবে শিকার করা হচ্ছে তাদের।
সারাবিশ্বে যেখানে পরিযায়ী পাখিদের সম্মান জানায় আর বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ এদের হত্যা করে থাকে। শিক্ষিত সমাজের আমরাও অনেক সময় কৌতূহলী হয়ে রসনা বিলাসের জন্য কিনে শিকারিদের মৌন সমর্থন দেই।

Share :