• সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১

মাশরুম চাষে অপার সম্ভাবনা

বছরে দেশে উৎপাদন হচ্ছে ৮০০  কোটি টাকার মাশরুম
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২০
দেশে অর্থকরী ফসল হিসেবে মাশরুম চাষের অপার সম্ভাবনা।  মাশরুম চাষ স¤প্রসারণ ও জনপ্রিয় করতে পারলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। অন্যদিকে, দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা করতে পারলে মাশরুমের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হবে। তাই মাশরুম চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে  শীঘ্রই উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, মাশরুম উৎপাদন দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।  দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০,০০০  মেট্রিক টন মাশরুম প্রতি বছর উৎপাদন হচ্ছে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮০০  কোটি টাকা। প্রায়  দেড় লক্ষ মানুষ মাশরুম ও মাশরুমজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণন সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ প্রায় সব  দেশেই মাশরুম আমদানি করে থাকে  বাংলাদেশ  থেকে বিশ্বের বিভিন্ন  দেশে মাশরুম রপ্তানির অনেক সুযোগ রয়েছে।
মাশরুম চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শীঘ্রই উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক প্রতিদিনে সংবাদকে বলেন, এই সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে। দেশের  বেশির ভাগ মানুষ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং ভূমিহীন। তাঁদেরকে মাশরুম চাষে সম্পৃক্ত করতে পারলে কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ তৈরি হবে। মাশরুমের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে গবেষণা বাড়াতে হবে। গবেষণা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও সিজনভিত্তিক নতুন জাতের মাশরুম উদ্ভাবন করতে হবে এবং চাষ স¤প্রসারণ করতে হবে।  সেজন্য মাশরুম বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের আমরা কাজে লাগাব। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটকে শক্তিশালী করা হবে। শীঘ্রই প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে আমরা  দেশের হর্টিকালচার  সেন্টার, মাশরুম  সেন্টার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করব যাতে করে তারা নতুন জাত উদ্ভাবন করতে পারে। কর্মকর্তা, চাষী এবং উদ্যোক্তাদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।   
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন,  দারিদ্র্যবিমোচনে এবং নারী, শিশু, অক্ষম ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠির পুষ্টিচাহিদা পূরণেও মাশরুম বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। মাশরুম চাষ শুরু করার জন্য অধিক পুঁজির প্রয়োজন হয় না বিধায় হতদরিদ্র  ভূমিহীন মানুষও মাশরুম চাষ করতে পারেন। মাশরুম চাষে অল্প দিনেই ফলন পাওয়া যায় এবং লাভসহ পুঁজি ঘরে আসে। অন্যদিকে, মাশরুম একটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু ঔষধি গুণসম্পন্ন খাবার হওয়ায় সহজেই পুষ্টিচাহিদা পূরণ করা সম্ভব। মাশরুম চাষের মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থানও হতে পারে।  
মাশরুমের ঔষধি গুণাগুণ অপরিসীম হওয়ায় এর কবিরাজি ব্যবহারও বহু বছরের ঐতিহ্য। তথাপি বিগত দুই দশকে মাশরুমের ঔষধি প্রয়োগ নিয়ে গবেষণায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। হাইপারটেনশন, হাইপারকোলেসটেরোলমিয়া এবং ক্যানসারের মতো ভয়ঙ্কর  রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে মাশরুমের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সা¤প্রতিক গবেষণায় মাশরুমে এমন কতকগুলো ঔষধি উপাদান পাওয়া  গেছে যাদের ইমুনোমোডিউলেটরি, কার্ডিওভাসকুলার, লিভার  প্রোটেকটিভ, অ্যান্টিফাইব্রোটিক, অ্যান্টিইনফ্লামেটরি, অ্যান্টিডায়াবেটিক এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা আছে। মাশরুম  থেকে এমন কতকগুলো উপাদান পৃথক করা সম্ভব হয়েছে যা এইডসের জীবাণু এইসআইভি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব গুণের জন্যই মাশরুম সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। 
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক নিরদ চন্দ্র সরকার বলেন, বাংলাদেশের  প্রেক্ষাপটে মাশরুম একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফসল। একদিকে, মাশরুম একটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন খাবার, অন্যদিকে তা চাষ করার জন্য  কোন আবাদী জমির প্রয়োজন হয় না। ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার বাংলাদেশে খাবারের চাহিদা বাড়ছে অথচ খাবার  যোগান  দেয়ার জমি প্রতিবছর কমছে। এই অবস্থায়, অনুৎপাদনশীল  ফেলনা জমির স্বল্প পরিমাণ ব্যবহার করেই বিপুল পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করা যায়। তাছাড়া, বাংলাদেশের আবহাওয়া সারাবছর মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী।  দেশে মাশরুম চাষের উৎপাদন মাধ্যমের ( যেমন খড়) পর্যাপ্ততা রয়েছে। মাশরুম চাষ পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল।
মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাশরুম চাষের কতকগুলো উল্লেখযোগ্য দিক হলো মাশরুম চাষের জন্য  তেমন জায়গা জমির প্রয়োজন হয় না।  বসতবাড়িতে এবং বাড়ির আশপাশেই কুঁড়েঘরেও মাশরুম চাষ সম্ভব। মাশরুম চাষের জন্য সবল সামর্থ্যবান শ্রমিকও প্রয়োজন হয় না। আপরদিকে ধান এবং গম হলো আমাদের প্রধান দুটি অর্থকরী ফসল। 
উল্লেখ্য মাশরুম চাষ ধান এবং গম চাষের তুলনায় লাভজনক। ক্রয়কৃত বীজে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে বসতবাড়িতেই মাশরুম চাষ সম্পন্ন করা যায়। ধান বা গম চাষে  যে সময় লাগে সেই সময়ে চার চালান মাশরুম চাষ করা যায়। ফলে অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় মাশরুম আবাদের মাধ্যমে তাড়াতাড়ি কৃষকের হাতে অর্থ ফিরে আসে। তাই এই কৃষির দ্বারা খুব দ্রুত কৃষি ঋণ পরিশোধ করে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করা সম্ভব।

Share :