• সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১

চোখ জুড়ানো সাদা-গোলাপী পদ্মবিল 

রুমন চক্রবর্তী: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ 
প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাইনহা বিল। যেখানে সাদা-গোলাপী পদ্মফুল দেখতে প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমান। হাজার হাজার পদ্মফুলের ফাঁকে ফাঁকে পদ্ম পাতাগুলো জলের সঙ্গে মিতালী গড়ে তুলেছে। আবার সাথে যোগ হয়েছে জলজ বিভিন্ন প্রজাতির পোকাদের বসবাস। একটু গভীরভাবে দেখলেই চোখে ভেসে উঠবে বিভিন্ন প্রজাতি দেশীয় মাছের ছোটাছুটি।
সবুজ পদ্মপাতার মাঝে পদ্মফুলগুলো যেন অপরূপ সাজে সেজেছে। আকাশের নীল রঙ ছুঁয়ে দেয় পদ্মফুলের ফাঁকে ফাঁকে। জলের ওপর এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ব্যাকুল হয়ে যান দর্শনার্থীরা। পদ্ম বিলের প্রকৃতির কথা বলে শেষ করার নয়। সকাল পেরিয়ে বিকেল গড়ালেই বেড়ে যায় প্রকৃতি প্রেমীদের ঢল। চঞ্চল আর উতাল মনকেও শান্ত করে দেবে এই পদ্মের সমারোহ।
গত কয়েক বছর ধরেই এই বিলটিতে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। যত দিন যাচ্ছে মানুষের উপস্থিতিই বলে দিচ্ছে কত সুন্দর বিলটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এর সৌন্দর্য ও পরিচিতি কিশোরগঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য স্থানেও। তাইতো কিশোরগঞ্জ জেলার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও প্রতিদিনই ভিড় করছে সৌন্দর্য পিপাসুরা।
তাড়াইল উপজেলার সাচাইল ইউনিয়নের দড়িজাহাঙ্গীরপুর গ্রামের জয়বাংলা বাজার সংলগ্ন এই কাইনহা বিল। দূর থেকেই চোখে পড়বে হাজারো পদ্মফুলের মেলবন্ধন। শীতের আগমনী বার্তা হিসেবেই পদ্মফুলগুলো ফুটে ওঠে। প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস সেখানে ফুলগুলো আপন মনে ফোটে। পদ্মফুলের রাজত্বের কারণে সেটি এখন পদ্মবিল নামেই বেশি পরিচিত।
এই সময়টাতে বিলের আশেপাশের এলাকার দিনমজুরদের আয়ের আরেকটি উৎসও তৈরি হয়। তারা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা করে দর্শনার্থীদের পদ্মবিলের ভেতরে নিয়ে যান। নৌকা যতই বিলের ভেতরে প্রবেশ করে, পদ্মফুলের সৌন্দর্য ততই মনোমুগ্ধকর হয়। নৌকাগুলোতে সর্বোচ্চ তিনজন একসঙ্গে উঠতে পারে। পুরো বিলটি ঘুরে দেখতে মাঝিকে দিতে হয় ২০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে সপ্তাহের শুক্রবারে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকায় ওইদিন মাঝিদেরও উপার্জন বেশি হয়।
পরিবারের সাথে ঘুরতে এসেছিলেন দীপ্তি ও পুন্যা। মুগ্ধ চিত্তে উপভোগ করলেন পদ্মবিল। তারা বলেন, হঠাৎ করেই পদ্মবিল ঘুরতে এসেছি। বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেক বেশি ভালো লেগেছে। অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন, কিন্তু তারা ফুলগুলো ছিড়ে নষ্ট করে ফেলেন। যা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। অযথা ফুল তুলে পদ্মবিলটির সৌন্দর্য কমিয়ে তুলছে। যদি ফুলই না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ এখানে আসবে না।
প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্য সত্যিই অবিশ্বাস্য। বর্ষাকালে এ বিলের প্রায় দেড় হাজার শতাংশ জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পদ্মফুল ফোটে। বর্ষা মৌসুমে এ বিলের চারিদিকে শুধু পদ্ম আর পদ্ম। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গোলাপী রঙের পদ্মফুলের পাশাপাশি সাদা পদ্ম দেখেও চোখ জুড়িয়ে যায়। 
স্থানীয় বাসিন্দা ডা. মুর্শেদ উদ্দিন কাকন বলেন, প্রাকৃতিকভাবেই বিলটিতে পদ্মফুল ফুটেছে। বহু বছর ধরেই বিলটিতে পদ্মফুল ফোটে। কিন্তু মানুষের ততটা আনাগোনা ছিল না। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে অনেকেই ছবি দেয়, আর মানুষের আসা-যাওয়াও বাড়তে শুরু করেছে।
বিলে পৌঁছানোর রাস্তাটি কাদায় ভরা। যেতে অনেক কষ্ট হলেও ফুলের সমারোহ দেখতে বহুদূর থেকেও মানুষ ছুটে আসছে। এখানে আসলে যে কারো মন ভালো হবেই।
এ গ্রামের বাসিন্দা মাঝি মো. বাবু মিয়া বলেন, পদ্ম বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ এখানে ছুটে আসছেন। খেতে-খামারে কাজ করার পাশাপাশি এই সময়টাতে আমি নৌকা চালিয়ে বাড়তি একটা আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে পর্যটকদের যাতায়াত পথ এবং বসার জায়গা তৈরিসহ এই সময়টাতে নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জানাচ্ছি। 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, এখন বর্ষার সময়, তাই পদ্মফুল ফুটেছে নিজের মতো করে। বর্ষা মৌসুমে গ্রামটিতে থাকে পদ্মফুলের বিশাল সমারোহ। তাই এটি সবার কাছে পদ্মবিল হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। জেলার সমস্ত জলাভূমি অঞ্চলে কীভাবে পদ্মফুল ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আমরা পদ্মফুল গবেষকদের সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবো। 
স্থানীয়রা মনে করেন, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পদ্মফুল সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে এ অঞ্চলের। তাইতো শরৎকালে পদ্মবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসেন। যথাযথভাবে বিলটি পরিচর্চায় রাখলে ভবিষ্যতে এই গ্রামটি দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত হবে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনযোগে কিশোরগঞ্জ সদরে পৌঁছাতে হবে। তারপর জেলা শহরের পুরান থানা বা কলাপাড়া মোড় থেকে মিশুক বা অটোরিকশার মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে দড়িজাহাঙ্গীরপুর ব্রিজের কাছে। ক্ষাণিকটা গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে পৌঁছে যাবেন পদ্মবিলের কাছে। সেখানে মাঝিদের সঙ্গে দরদাম করে ঘণ্টাব্যাপী চুক্তিতে ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে উপভোগ করতে পারেন পদ্মবিল।

Share :